লিখেছেনঃ
2019-12-13BDT12:29 [ছবিটি লেখকের হাতে আঁকা, প্রায় এক দশক আগের] শিরোনামটা "এলোমেলো শৈশব" দিবার একমাত্র কারণ, ঘটনাগুলোর সময়রেখা কোন নির্ধারিত ছকে বাঁধা নয়। ছোটবেলার যখন যে বিষয়টা মাথায় আসছে, সেটাই লিখে ফেলছি। ব্লগে লিখে রাখছি খুব বড় কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। একান্তই নিজের জন্য! অনেক বয়স যখন হয়ে যাবে, বুড়িয়ে যাব যখন, তখন যদি নিজে পড়তে নাও পারি, নাতি-নাতনিদের অনুরোধ করব পড়ে শোনাবার জন্য। আর পাবলিকলি রাখা হচ্ছে এজন্য যে, কাছের মানুষগুলোর মন্তব্য-ভৎর্সনা থেকে সবাই ধারণা পাবেন, আমার আশেপাশে কত রসিক বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন।  যাই হোক, শুরু করি।   আধবোতল সরিষা তেলঃ আইয়ুব দাদুর হোমিও ওষুধের দোকানটা ঠিক আমাদের বাসাটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। আব্বু আম্মু দুজনই হাইস্কুলে চলে যেতেন ঠিক আমরা কেজি স্কুল থেকে আসবার আগে-পরে অর্থাৎ বেলা ১০টার দিকে। দুই ভাই মিলে খেলাধুলা করতাম দাদুর দোকানের বারান্দায়। বলে রাখা ভালো সমবয়সী হবার কারণে খুবই মারামারি করতাম দুজনে। দাদুর ভাষ্যমতে 'একজনের পা আরেকজনের মাথায়' টাইপ অবস্থা! তো এরকম মারামারি করার পর আম্মু নাকি খুব মেরেছিল সেদিন! মার খেয়ে দুই ভাই মিলে নাকি এক বোতল সরিষার তেল ভাগ করে গিলে ফেলেছিলাম! ভাবা যায়! পুরা আধাবোতল সরিষা তেল!  [ এ লেখার যদি আরও সংখ্যা থাকে তাহলে দাদুর নাম অনেকবার আসবে। ]   আমার হারিয়ে যাওয়াঃ এক বিকেলে বাসার সামনে খেলছিলাম বা হাঁটছিলাম। তখন নার্সারি কিংবা কেজিতে পড়ি। আমাদের বাড়িটা মফস্বলে। সেখান থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ি ভবানিপুর মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। আব্বু মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন। আমি আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছো? আব্বু বলল, দাদুর বাড়ি। যাবে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লাম মোটরসাইকেলের সামনে। কাউকে না বলে চলে যাওয়া আমাদের বাসায় কাজে সাহায্য করার জন্য যে ছিলেন, তার নাম ছিল শিল্পি। অনেকক্ষণ পরে আমাকে বাসায় পাওয়া গেল না যখন তার ধারণা হল, আমি হারিয়ে গিয়েছি। আম্মু, ভাইয়া, শিল্পি, আইয়ুব দাদু সবাই মিলে খোঁজা শুরু করে দিল। মোবাইল ছিল না, আব্বুকে জানানো গেল না। সারা বাজার খোঁজা হল। আম্মু নিশ্চিত আমাকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে। সবাই কান্নাকাটি অবস্থা! সন্ধ্যার পর আব্বু আমি দাদুর বাড়ি থেকে ফিরলাম। আমাকে দেখে শিল্পি আপু কেঁদে দিল! বেচারা ধরেই নিয়েছিল, আমি নাই হয়ে গেছি। পরে অবশ্য আম্মুর হাতে একটু মার খেতে হল। আব্বুও যথেষ্ট বকা খেলেন না বলে নিয়ে যাবার জন্য!   ঝাড়ুদার মাঃ বাজারের চৌরাস্তার মোরে আমাদের একটা দোকান আছে। একসময় আমার ছোটচাচা এখানে ওষুধের দোকান করতেন। তারও আগে আমার দাদা বসতেন এখানে। তারও আগে আমাদের মফস্বলের বাসাটাই ছিল আমার দাদার ডিসপেনসারি! তো এক দুপুরে বাসা থেকে কেন যেন চাচ্চুর দোকানে যাচ্ছি। বের হবার সময় দেখলাম আম্মু ঘর ঝাড়ছে। স্বাভাবিক একটা বিষয়। চাচ্চুর দোকানে গেলাম। বসে আছি। সিভিট খাচ্ছিলাম যতদূর মনে পড়ে। এক অপরিচিত ভদ্রলোক এলেন। ভাইস্তা সম্বোধন করে কথা বলতে লাগলেন। এক সময় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বু কি করে? যদিও আমার ধারণা তিনি জানেন আমার আব্বু কি করেন। কিন্তু ছোটবেলায় এমন অনেকেরই হয়, পরিচিত জনেরাও জিজ্ঞেস করেন বাবা-মা কি করেন। এমনকি নিজের মামাও জিজ্ঞেস করেন, বলতো তোমার আব্বুর নাম কি? তোমার নানাজানের নাম কি?! তখন খুব মেজাজ খারাপ লাগতো। নিজের বাপের নাম জানে না! তো যাই হোক,  সে ভদ্রলোককে বললাম, আব্বু শিক্ষক। যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন, আম্মু কি করে? আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার আর মনেই পড়ছে না আম্মু কি করে!? তৎক্ষণাৎ মনে হল, বাসা থেকে বের হবার সময় আম্মুকে ঘর ঝাড়ু দিতে দেখেছি। চট করে বললাম, আমার আম্মু ঘর ঝাড়ু দেয়। এ কথা শোনার পর মানুষটার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু বাসায় এসে আম্মুকে বলেছিলাম ঘটনাটা। এবং এটা ছিল আমার অনেক বড় ভুল! আম্মু এ নিয়ে নানান বাড়ির আত্মীয় স্বজনের কাছে অনেক গল্প করে হাসাহাসি করতেন দীর্ঘদিন। আমার মেজাজ খারাপ হত খুব। এখন ভালই লাগে!   মাকলার ডিমঃ ছোটবেলায় মাকড়সা উচ্চারণ করতে পারতাম না। বলতাম মাকলা! আইয়ুব দাদুর হোমিও দোকান। হোমিও দোকান মানে ছোট ছোট চিনির বড়ি! আহা কি মজার জিনিস। প্রতিদিন দাদুর দোকানে গিয়ে হাত পাততাম। দাদু দুই ভাইকে মুঠোভরে চিনির সাদা সাদা গোলাকার বড়িগুলো দিতেন খেতে। দাদু হয়তো প্রথম প্রথম বলতো মাকড়শার ডিম এগুলো! আমরা উচ্চারণ করতাম 'মাকলার ডিম'। কালের বিবর্তনে এ জিনিস আমার কাছে আসলেই 'মাকলার ডিম' হয়ে গেল! আমি অনেক বড় হয়েও ভাবতাম এই জিনিসের ছদ্দ নাম 'মাকলার ডিম'।  দাদুর দোকানে শেষ ছুটিতে গিয়েও 'মাকলার ডিম' খেতে ভুলিনি! ৬৬৯ জুন ২৪, ২০১৭ ০৭:৫৬ অপরাহ্ন ২ বছর পূর্বে

জানা নেই!

[ছবিটি লেখকের হাতে আঁকা, প্রায় এক দশক আগের]

শিরোনামটা "এলোমেলো শৈশব" দিবার একমাত্র কারণ, ঘটনাগুলোর সময়রেখা কোন নির্ধারিত ছকে বাঁধা নয়। ছোটবেলার যখন যে বিষয়টা মাথায় আসছে, সেটাই লিখে ফেলছি। ব্লগে লিখে রাখছি খুব বড় কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। একান্তই নিজের জন্য! অনেক বয়স যখন হয়ে যাবে, বুড়িয়ে যাব যখন, তখন যদি নিজে পড়তে নাও পারি, নাতি-নাতনিদের অনুরোধ করব পড়ে শোনাবার জন্য। আর পাবলিকলি রাখা হচ্ছে এজন্য যে, কাছের মানুষগুলোর মন্তব্য-ভৎর্সনা থেকে সবাই ধারণা পাবেন, আমার আশেপাশে কত রসিক বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন।  যাই হোক, শুরু করি।

 

আধবোতল সরিষা তেলঃ আইয়ুব দাদুর হোমিও ওষুধের দোকানটা ঠিক আমাদের বাসাটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। আব্বু আম্মু দুজনই হাইস্কুলে চলে যেতেন ঠিক আমরা কেজি স্কুল থেকে আসবার আগে-পরে অর্থাৎ বেলা ১০টার দিকে। দুই ভাই মিলে খেলাধুলা করতাম দাদুর দোকানের বারান্দায়। বলে রাখা ভালো সমবয়সী হবার কারণে খুবই মারামারি করতাম দুজনে। দাদুর ভাষ্যমতে 'একজনের পা আরেকজনের মাথায়' টাইপ অবস্থা! তো এরকম মারামারি করার পর আম্মু নাকি খুব মেরেছিল সেদিন! মার খেয়ে দুই ভাই মিলে নাকি এক বোতল সরিষার তেল ভাগ করে গিলে ফেলেছিলাম! ভাবা যায়! পুরা আধাবোতল সরিষা তেল! 

[ এ লেখার যদি আরও সংখ্যা থাকে তাহলে দাদুর নাম অনেকবার আসবে। ]

 

আমার হারিয়ে যাওয়াঃ এক বিকেলে বাসার সামনে খেলছিলাম বা হাঁটছিলাম। তখন নার্সারি কিংবা কেজিতে পড়ি। আমাদের বাড়িটা মফস্বলে। সেখান থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ি ভবানিপুর মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। আব্বু মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন। আমি আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছো? আব্বু বলল, দাদুর বাড়ি। যাবে নাকি? সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লাম মোটরসাইকেলের সামনে। কাউকে না বলে চলে যাওয়া আমাদের বাসায় কাজে সাহায্য করার জন্য যে ছিলেন, তার নাম ছিল শিল্পি। অনেকক্ষণ পরে আমাকে বাসায় পাওয়া গেল না যখন তার ধারণা হল, আমি হারিয়ে গিয়েছি। আম্মু, ভাইয়া, শিল্পি, আইয়ুব দাদু সবাই মিলে খোঁজা শুরু করে দিল। মোবাইল ছিল না, আব্বুকে জানানো গেল না। সারা বাজার খোঁজা হল। আম্মু নিশ্চিত আমাকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে। সবাই কান্নাকাটি অবস্থা!

সন্ধ্যার পর আব্বু আমি দাদুর বাড়ি থেকে ফিরলাম। আমাকে দেখে শিল্পি আপু কেঁদে দিল! বেচারা ধরেই নিয়েছিল, আমি নাই হয়ে গেছি। পরে অবশ্য আম্মুর হাতে একটু মার খেতে হল। আব্বুও যথেষ্ট বকা খেলেন না বলে নিয়ে যাবার জন্য!

 

ঝাড়ুদার মাঃ বাজারের চৌরাস্তার মোরে আমাদের একটা দোকান আছে। একসময় আমার ছোটচাচা এখানে ওষুধের দোকান করতেন। তারও আগে আমার দাদা বসতেন এখানে। তারও আগে আমাদের মফস্বলের বাসাটাই ছিল আমার দাদার ডিসপেনসারি! তো এক দুপুরে বাসা থেকে কেন যেন চাচ্চুর দোকানে যাচ্ছি। বের হবার সময় দেখলাম আম্মু ঘর ঝাড়ছে। স্বাভাবিক একটা বিষয়।

চাচ্চুর দোকানে গেলাম। বসে আছি। সিভিট খাচ্ছিলাম যতদূর মনে পড়ে। এক অপরিচিত ভদ্রলোক এলেন। ভাইস্তা সম্বোধন করে কথা বলতে লাগলেন। এক সময় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বু কি করে? যদিও আমার ধারণা তিনি জানেন আমার আব্বু কি করেন। কিন্তু ছোটবেলায় এমন অনেকেরই হয়, পরিচিত জনেরাও জিজ্ঞেস করেন বাবা-মা কি করেন। এমনকি নিজের মামাও জিজ্ঞেস করেন, বলতো তোমার আব্বুর নাম কি? তোমার নানাজানের নাম কি?! তখন খুব মেজাজ খারাপ লাগতো। নিজের বাপের নাম জানে না!

তো যাই হোক,  সে ভদ্রলোককে বললাম, আব্বু শিক্ষক। যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন, আম্মু কি করে? আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার আর মনেই পড়ছে না আম্মু কি করে!? তৎক্ষণাৎ মনে হল, বাসা থেকে বের হবার সময় আম্মুকে ঘর ঝাড়ু দিতে দেখেছি। চট করে বললাম, আমার আম্মু ঘর ঝাড়ু দেয়। এ কথা শোনার পর মানুষটার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু বাসায় এসে আম্মুকে বলেছিলাম ঘটনাটা। এবং এটা ছিল আমার অনেক বড় ভুল! আম্মু এ নিয়ে নানান বাড়ির আত্মীয় স্বজনের কাছে অনেক গল্প করে হাসাহাসি করতেন দীর্ঘদিন। আমার মেজাজ খারাপ হত খুব। এখন ভালই লাগে!

 

মাকলার ডিমঃ ছোটবেলায় মাকড়সা উচ্চারণ করতে পারতাম না। বলতাম মাকলা! আইয়ুব দাদুর হোমিও দোকান। হোমিও দোকান মানে ছোট ছোট চিনির বড়ি! আহা কি মজার জিনিস। প্রতিদিন দাদুর দোকানে গিয়ে হাত পাততাম। দাদু দুই ভাইকে মুঠোভরে চিনির সাদা সাদা গোলাকার বড়িগুলো দিতেন খেতে। দাদু হয়তো প্রথম প্রথম বলতো মাকড়শার ডিম এগুলো! আমরা উচ্চারণ করতাম 'মাকলার ডিম'। কালের বিবর্তনে এ জিনিস আমার কাছে আসলেই 'মাকলার ডিম' হয়ে গেল! আমি অনেক বড় হয়েও ভাবতাম এই জিনিসের ছদ্দ নাম 'মাকলার ডিম'। 

দাদুর দোকানে শেষ ছুটিতে গিয়েও 'মাকলার ডিম' খেতে ভুলিনি!


বিষয়ঃ আত্মজীবনী | ট্যাগসমূহঃ ব্যক্তিগত কথাকাব্য আত্মজীবনী [ ৬৬৯ ] 669 [ ২ ] 2
  • শেয়ার করুনঃ
পাঠিয়ে দিনঃ

ব্লগারঃ অর্বাচীন উজবুক

ব্লগ লিখেছেনঃ ৩১ টি
ব্লগে যোগদান করেছেনঃ ২ বছর পূর্বে

২ টি মন্তব্য ও প্রতিমন্তব্য

স্বপ্নচারী

August 07, 2017 07:58 AM , ২ বছর পূর্বে
শৈশবগুলো আজও স্মৃতিতে নাড়া দেয়। কী মজাই না ছিল। ইশ যদি আবার শৈশবে ফিরে যেতে পারতাম।
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

অর্বাচীন উজবুক
Nov 03, 2017 02:23 PM , ২ বছর পূর্বে
স্মৃতি জিনিসটার প্রতি এক ধরণের অভিমান বোধ করি মাঝে মাঝে। সুখের হোক আর দুঃখের, স্মৃতি সবসময় বেদনাবিধুর।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করবার জন্য আপনাকে লগইন করতে হবে।
ব্লগের তথ্য
মোট ব্লগারঃ ৬৬ জন
সর্বমোট ব্লগপোস্টঃ ৯৩ টি
সর্বমোট মন্তব্যঃ ১২২ টি


ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও-এ প্রকাশিত সকল লেখা এবং মন্তব্যের দায় লেখক-ব্লগার ও মন্তব্যকারীর। কোন ব্লগপোস্ট এবং মন্তব্যের দায় কোন অবস্থায় 'ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও' কর্তৃপক্ষ বহন করবে না