লিখেছেনঃ
2019-09-22BDT16:17 ১. কাকভেজা হয়ে রেশাওয়াত যখন ঘরে ফিরল ঘড়িতে তখন সময় রাত ১১টা। আজ বিকেল অবধি আবহাওয়াটা ভালই ছিল। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছিল। আগেরদিন নিজের ফাস্টফুডে অনেক রাত পর্যন্ত কাটাতে হয়েছে ওকে। তাই আজ বেলা করে ঘুম ভেঙেছে তার। ভূতেরগলি মসজিদের পাশেই রেশাওয়াতের ছোট্ট ফুডকোর্টটা। ওর বন্ধু আরিফ ঢাকায় এসেছিল ভারতের ভিসা সংক্রান্ত একটা কাজে। আজ সে ফিরে গেল। গাড়ি ছিল রাত দশটায়। স্টার কাবাব থেকে খাওয়া সেরে আরিফকে শ্যামলি রিং রোডে নামিয়ে দিল রেশাওয়াত। সমস্যাটা বাধল ফিরবার পথে। ফুটওভারব্রিজটা পেরিয়ে রাস্তার ওপাশে যেতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করল। কয়েকটা দোকানের শাটার পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। সাত নম্বর বাসটা পেয়ে তাই রেশাওয়াত তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ল। সংসদ ভবন এলাকা পার হতে হতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি রুপ নিল মুষলধারে। আনোয়ার খান মডার্নের সামনে বাস নামিয়ে দিল তাকে। রেশাওয়াত বুঝতে পারল না কি করবে। মডার্নের সামনে বা আশেপাশে ছাউনি মত কিছু নেই যে ঠাই নিয়ে দাঁড়াবে ও। অগত্যা দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করল গ্রিনরোডের দিকে। বৃষ্টি যেন থামছেই না। বরঞ্চ বেড়েই চলেছে। হুট করে রেশাওয়াত টের পেল শিলা পড়ছে। কেন যেন এতক্ষণের বিরক্তিটা কমলো একটু ওর। হাঁটার গতি কমিয়ে দিল একটু। আনমনা হয়ে চলতে গিয়ে একটু হোঁচট খেল। সমস্যা আরেকটা। থেকে থেকেই ওকে চশমা মুছতে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পরই চশমার সামনের অংশ পানি পড়ে ঘোলা করে দিচ্ছে সব। রেশাওয়াতের মনে হল বিজ্ঞানী সফদর আলী সত্যি সত্যি যদি থাকতেন, তবে চশমার ওয়াইপারটা এতোদিনে সবার মাঝে প্রচলিত হয়ে যেত।    ভেজা শরীর নিয়ে কলিং বেল চাপল রেশাওয়াত। অদিতি দরজা খুলেই চমকে গেল। কি অবস্থা করে এসেছে সে। একটু রাগও দেখাল কোন শুকনা জায়গায় কেন ও আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করেনি এজন্য। অদিতি দৌড়ে গেল তোয়ালা আর শুকনো কাপড় আনতে। রেশাওয়াত দুইবার হাঁচি দিয়ে বুঝতে পারল, ঠান্ডাটা জমে এসেছে। জ্বরটর বুঝি বাঁধবে! রাতে আর কিছু খেল না রেশাওয়াত। অদিতি জোড় করল অনেক। কিন্তু ও জানাল আরিফের সাথে খাওয়ার কথাটা। শোয়ামাত্র গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রেশাওয়াত। ওর ঘুম ভাঙল গভীর রাতে। প্রায় তিনটা বাজে তখন। ও বুঝতে পারল জ্বরে পুরে যাচ্ছে গা। অদিতিকে ডেকে তুলল ও। পাঠক ভাবছেন জ্বরের কারণে অদিতিকে ডাকল রেশাওয়াত। আসলে জ্বরজারি যাই হোক না কেন, অদিতিকে রেশাওয়াত ঘুম থেকে কখনও এভাবে ডেকে তোলে না। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে অদিতিকে ঘুম থেকে জাগাল ও। খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প বলা শুরু করল। তার স্বপ্নের গল্প। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা শব্দে চমৎকার বাতাস বইছে। ঘুমভাঙা চোখে অদিতি শুনছে রেশাওয়াতের গল্প। চলুন আমরাও শুনে আসি।    ২.  স্বপ্নটা ছিল সাদাকালো। কি করে যেন সময়টা ২০১৭ সাল না। ১৯৭১ সাল যেন। শেষ বিকেল; সন্ধ্যা নামল বলে। রেশাওয়াত বসে আছে ওর হোটেলের ক্যাশবাক্সের সামনে। ফাস্টফুড স্বপ্নে কীভাবে যেন হোটেল হয়ে গেছে! আজকাল বেচাকেনা ভালো না। সারাক্ষণ শাটার অর্ধেক নামিয়ে রাখতে হয়। হুটহাট করে পাক-আর্মির জিপ হইহই করতে করতে চলে যায়। তখন দোকান পুরো বন্ধ রাখতে হয়। কাঁচামালেরও খুব ঘাটতি। দামও চড়া। রেশাওয়াত হিসাবের খাতায় চোখ নামিয়ে কি যেন লিখছে। মনে হচ্ছে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না এই কদিন। হঠাত ও শুনতে পেল শাটার তুলবার শব্দ। চার-পাঁচজন মানুষ তার হোটেলে দ্রুত ঢুকবার চেষ্টা করছে। রেশাওয়াত একটু ভরকে গেল। সে বুঝতে পারল না এরা কারা। ভেতরে সর্বমোট চারটা টেবিল। গোলমত টেবিল। রেশাওয়াতকে কিছু বুঝতে দিবার আগেই এই কয়েকজন মানুষ ধরমর করে সবথেকে কোনার টেবিলে গিয়ে বসল। সবার চোখ বসে যাওয়া আর নিচের অংশ কালো। বোঝাই যাচ্ছে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এই কয়েকজন মানুষ। রেশাওয়াত কি বলবে বুঝতে পারল না। এর মাঝেই একজন গিয়ে পুরো শাটার নামিয়ে দিল। যেন বাহিরে থেকে মনে হয় বন্ধ।  একজন রেশাওয়াতকে সরাসরি তুই সম্বোধন করে বলল, 'কি আছে রে তোর এখানে? খুব ক্ষুধা লেগেছে। যা আছে দে।' আরেকজন বলল, 'ভাত হবে নাকি রে?' এই লোকটার মুখটা একটু লম্বা ধরনের, সুদর্শন এবং চোখের ভ্রু অনেক ঘন। তাকে আগেরজন জুয়েল সম্বোধন করে বলল, 'ভাত-টাত যা আছে খাবনে। ব্যাপার হইল পেটে কিছু পরতে হবে।' রেশাওয়াতের একটু একটু বুঝতে পারল এরা কারা। ও দেখল খাবার আইটেম বলতে খানিকটা ছোলাবুট আর তিনটা শিঙাড়া আছে। দোকানের দুইটা ছেলের মধ্যে একজন আজ আসেনি। আর একজন কারওয়ান বাজারে গিয়েছে বাজার আনতে। 'ভাইজানেরা যা আছে তাতে আপনাদের পেট ভরবে কি না জানি না' বলে রেশাওয়াত নিজেই যা ছিল সব পরিবেশন করে দিল মানুষগুলোর মাঝে। মোট সাতজন মানুষ। কি আগ্রহ নিয়েই না খাচ্ছে! একজন টক খুঁজলেন। তার নাম মনে হচ্ছে বদি। বাকিরা এই নামেই তাকে ডাকছে। রেশাওয়াত তেঁতুলগোলা এগিয়ে দিল। খাওয়া শেষ করে সবাই হেলান দিয়ে বসল চেয়ারগুলোতে। সিগারেট ধরালেন জুয়েল নামে লোকটা। তার কাছে বাকিরাও সিগারেট নিল। বদি নামে লোকটা সিগারেট টানতে টানতেই সোজা হয়ে বসলেন। পরিকল্পনা করছেন এমন ভঙ্গিতে বাকিদের কীসব বুঝাতে লাগলেন এই লোকটা। রেশাওয়াত যা বুঝল তা এরকম- এই সাতজন মানুষ ফার্মগেটে একটা অপারেশন চালাবে। অপারেশনের সময় মাত্র এক মিনিট!! বদি নামে লোকটা একজনকে লক্ষ্য করে বললেন, 'সামাদ, তুমি গাড়ি চালাবে।' আরেকজনকে বললেন, 'আলম তোমার চায়নিজ এলএমজিটা ঠিকঠাক তো?'। আর বাকিরা সম্ভবত স্টেনগান না কি যেন নিয়ে থাকবে। রেশাওয়াত আর যে শব্দগুলো ওদের পরিকল্পনা থেকে শুনল সেগুলো হল- রিভলবার, ফসফরাস গ্রেনেড আর গ্রেনেড-৩৬। পরিকল্পনা শেষ করে মানুষগুলোর মধ্যে বদি নামে লোকটা রেশাওয়াতকে তার নাম জিজ্ঞেস করল এবং বলল, 'আজ তোকে কিছুই দিতে পারব না রে। যেদিন এ দেশটা পাকসেনা মুক্ত হবে তোর এখানে আবার আসব। শুধু এ কয়জন না। আমাদের আরো লোক আছে। সবাই এসে খেয়ে যাব। আর বাসি ছোলা রাখবি না সেদিন কিন্তু।' রেশাওয়াত মৃদু হাসি দিয়ে বলল, 'জি আচ্ছা ভাই'। লোকগুলো চলে গেল আটটা বাজার আগেই। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট দিয়ে ফার্মগেটের দিকেই গেল মনে হল সরাসরি।     ৩. রেশাওয়াত গল্প শেষ করতে পারল না। ওর চোখে পানি চলে এল। অদিতি ওকে কি বলবে বুঝতে পারল না। রেশাওয়াত বলল, 'ক্র্যাক প্লাটুনের সাতজন এসেছিল অদিতি! ওরা আবার আসবে বলেছিল!' অশ্রু থামাতে পারল না অদিতিও। রাত পেরিয়ে গেল। গল্পের শেষ অংশে চলে এসেছি। রেশাওয়াতের ফাস্টফুড ভালই চলছে। শুধু একটা পরিবর্তন ইদানিং দেখা যাচ্ছে। ফাস্টফুডের চারটা টেবিলের মাঝে তিনটাতে সবাই বসতে পারে, খেতে পারে। কোনার একটা টেবিলে রেশাওয়াত কাউকে বসতে দেয় না। কেন দেয়না কেউ জানেনা। সেখানে একটা কাঠের টুকরার মাঝে কাগজ লাগিয়ে রেশাওয়াত লিখে রেখেছে, "RESERVED UNTIL THEY RETURN"   [ ফার্মগেট অপারেশন সংঘটিত হয় একাত্তর সালের ৭ আগস্ট। প্লাটুনের অন্যতম সদস্য সামাদের নিউ ইস্কাটনের বাসায় সবাই বসে সিদ্ধান্ত নেন ওই দিনই আক্রমণ চালাবেন তারা। অপারেশনের সময় নির্ধারিত হলো রাত ৮টা এবং এর জন্য সময় বরাদ্দ থাকবে ১ মিনিট। অস্ত্রসজ্জিত গেরিলা দলে ছিলেন ৭ তরুণ। জুয়েল, আলম, পুলু, স্বপন, সামাদ আর বদি। ঠিক করা হয় সামাদ গাড়ি চালাবেন। সবার হাতে থাকবে স্টেনগান, আলমের হাতে চায়নিজ এলএমজি। অতিরিক্ত অস্ত্রের মধ্যে সামাদের কাছে আছে রিভলবার, জুয়েল আর পুলুর কাছে আছে ফসফরাস গ্রেনেড আর গ্রেনেড-৩৬। এক মিনিটের মধ্যেই খান সেনা আর পাকি পেয়ারা রাজাকারদের দিগ্বিদিক অন্ধকার করে দেয় চৌকস গেরিলা দলটি। মুহূর্তেই মরণের স্বাদ পায় পাঁচ মিলিটারি পুলিশ ও ছয় রাজাকার। সফল এই অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন শহীদ বদিউজ্জামান। এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে সারা ঢাকায়, আর নতুন উদ্যাম যোগ করে সারা দেশের মুক্তিকামী মানুষের মনে। আর ব্যাপক ভীতি সঞ্চার করে খান সেনা আর তাদের দোসর রাজাকারদের মধ্যে। এভাবেই অনেকগুলো সফল অপারেশন চালান এই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা। ] প্রিয় পাঠক, ক্র্যাক প্লাটুন সম্পর্কে আরো জানুনঃ  উইকিপিডিয়া,  ক্র্যাক প্লাটুন : হার না মানা বীরত্বগাথা,  একদল মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিযোদ্ধার ‘ক্র্যাক প্লাটুন’,  দ্য লিজেন্ডারি ক্র্যাক প্লাটুন... ৯৮১ মার্চ ০৬, ২০১৭ ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন ২ বছর পূর্বে

১.

কাকভেজা হয়ে রেশাওয়াত যখন ঘরে ফিরল ঘড়িতে তখন সময় রাত ১১টা।

আজ বিকেল অবধি আবহাওয়াটা ভালই ছিল। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছিল। আগেরদিন নিজের ফাস্টফুডে অনেক রাত পর্যন্ত কাটাতে হয়েছে ওকে। তাই আজ বেলা করে ঘুম ভেঙেছে তার। ভূতেরগলি মসজিদের পাশেই রেশাওয়াতের ছোট্ট ফুডকোর্টটা। ওর বন্ধু আরিফ ঢাকায় এসেছিল ভারতের ভিসা সংক্রান্ত একটা কাজে। আজ সে ফিরে গেল। গাড়ি ছিল রাত দশটায়। স্টার কাবাব থেকে খাওয়া সেরে আরিফকে শ্যামলি রিং রোডে নামিয়ে দিল রেশাওয়াত। সমস্যাটা বাধল ফিরবার পথে। ফুটওভারব্রিজটা পেরিয়ে রাস্তার ওপাশে যেতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করল। কয়েকটা দোকানের শাটার পড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। সাত নম্বর বাসটা পেয়ে তাই রেশাওয়াত তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ল। সংসদ ভবন এলাকা পার হতে হতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি রুপ নিল মুষলধারে। আনোয়ার খান মডার্নের সামনে বাস নামিয়ে দিল তাকে। রেশাওয়াত বুঝতে পারল না কি করবে। মডার্নের সামনে বা আশেপাশে ছাউনি মত কিছু নেই যে ঠাই নিয়ে দাঁড়াবে ও। অগত্যা দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করল গ্রিনরোডের দিকে। বৃষ্টি যেন থামছেই না। বরঞ্চ বেড়েই চলেছে। হুট করে রেশাওয়াত টের পেল শিলা পড়ছে। কেন যেন এতক্ষণের বিরক্তিটা কমলো একটু ওর। হাঁটার গতি কমিয়ে দিল একটু। আনমনা হয়ে চলতে গিয়ে একটু হোঁচট খেল। সমস্যা আরেকটা। থেকে থেকেই ওকে চশমা মুছতে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পরই চশমার সামনের অংশ পানি পড়ে ঘোলা করে দিচ্ছে সব। রেশাওয়াতের মনে হল বিজ্ঞানী সফদর আলী সত্যি সত্যি যদি থাকতেন, তবে চশমার ওয়াইপারটা এতোদিনে সবার মাঝে প্রচলিত হয়ে যেত। 

 

ভেজা শরীর নিয়ে কলিং বেল চাপল রেশাওয়াত। অদিতি দরজা খুলেই চমকে গেল। কি অবস্থা করে এসেছে সে। একটু রাগও দেখাল কোন শুকনা জায়গায় কেন ও আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করেনি এজন্য। অদিতি দৌড়ে গেল তোয়ালা আর শুকনো কাপড় আনতে। রেশাওয়াত দুইবার হাঁচি দিয়ে বুঝতে পারল, ঠান্ডাটা জমে এসেছে। জ্বরটর বুঝি বাঁধবে! রাতে আর কিছু খেল না রেশাওয়াত। অদিতি জোড় করল অনেক। কিন্তু ও জানাল আরিফের সাথে খাওয়ার কথাটা। শোয়ামাত্র গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রেশাওয়াত। ওর ঘুম ভাঙল গভীর রাতে। প্রায় তিনটা বাজে তখন। ও বুঝতে পারল জ্বরে পুরে যাচ্ছে গা। অদিতিকে ডেকে তুলল ও। পাঠক ভাবছেন জ্বরের কারণে অদিতিকে ডাকল রেশাওয়াত। আসলে জ্বরজারি যাই হোক না কেন, অদিতিকে রেশাওয়াত ঘুম থেকে কখনও এভাবে ডেকে তোলে না। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে অদিতিকে ঘুম থেকে জাগাল ও। খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প বলা শুরু করল। তার স্বপ্নের গল্প। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা শব্দে চমৎকার বাতাস বইছে। ঘুমভাঙা চোখে অদিতি শুনছে রেশাওয়াতের গল্প। চলুন আমরাও শুনে আসি। 

 

২. 

স্বপ্নটা ছিল সাদাকালো। কি করে যেন সময়টা ২০১৭ সাল না। ১৯৭১ সাল যেন। শেষ বিকেল; সন্ধ্যা নামল বলে। রেশাওয়াত বসে আছে ওর হোটেলের ক্যাশবাক্সের সামনে। ফাস্টফুড স্বপ্নে কীভাবে যেন হোটেল হয়ে গেছে! আজকাল বেচাকেনা ভালো না। সারাক্ষণ শাটার অর্ধেক নামিয়ে রাখতে হয়। হুটহাট করে পাক-আর্মির জিপ হইহই করতে করতে চলে যায়। তখন দোকান পুরো বন্ধ রাখতে হয়। কাঁচামালেরও খুব ঘাটতি। দামও চড়া। রেশাওয়াত হিসাবের খাতায় চোখ নামিয়ে কি যেন লিখছে। মনে হচ্ছে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না এই কদিন। হঠাত ও শুনতে পেল শাটার তুলবার শব্দ। চার-পাঁচজন মানুষ তার হোটেলে দ্রুত ঢুকবার চেষ্টা করছে। রেশাওয়াত একটু ভরকে গেল। সে বুঝতে পারল না এরা কারা। ভেতরে সর্বমোট চারটা টেবিল। গোলমত টেবিল। রেশাওয়াতকে কিছু বুঝতে দিবার আগেই এই কয়েকজন মানুষ ধরমর করে সবথেকে কোনার টেবিলে গিয়ে বসল। সবার চোখ বসে যাওয়া আর নিচের অংশ কালো। বোঝাই যাচ্ছে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এই কয়েকজন মানুষ। রেশাওয়াত কি বলবে বুঝতে পারল না। এর মাঝেই একজন গিয়ে পুরো শাটার নামিয়ে দিল। যেন বাহিরে থেকে মনে হয় বন্ধ। 

একজন রেশাওয়াতকে সরাসরি তুই সম্বোধন করে বলল, 'কি আছে রে তোর এখানে? খুব ক্ষুধা লেগেছে। যা আছে দে।' আরেকজন বলল, 'ভাত হবে নাকি রে?' এই লোকটার মুখটা একটু লম্বা ধরনের, সুদর্শন এবং চোখের ভ্রু অনেক ঘন। তাকে আগেরজন জুয়েল সম্বোধন করে বলল, 'ভাত-টাত যা আছে খাবনে। ব্যাপার হইল পেটে কিছু পরতে হবে।'

রেশাওয়াতের একটু একটু বুঝতে পারল এরা কারা। ও দেখল খাবার আইটেম বলতে খানিকটা ছোলাবুট আর তিনটা শিঙাড়া আছে। দোকানের দুইটা ছেলের মধ্যে একজন আজ আসেনি। আর একজন কারওয়ান বাজারে গিয়েছে বাজার আনতে। 'ভাইজানেরা যা আছে তাতে আপনাদের পেট ভরবে কি না জানি না' বলে রেশাওয়াত নিজেই যা ছিল সব পরিবেশন করে দিল মানুষগুলোর মাঝে। মোট সাতজন মানুষ। কি আগ্রহ নিয়েই না খাচ্ছে! একজন টক খুঁজলেন। তার নাম মনে হচ্ছে বদি। বাকিরা এই নামেই তাকে ডাকছে। রেশাওয়াত তেঁতুলগোলা এগিয়ে দিল। খাওয়া শেষ করে সবাই হেলান দিয়ে বসল চেয়ারগুলোতে। সিগারেট ধরালেন জুয়েল নামে লোকটা। তার কাছে বাকিরাও সিগারেট নিল। বদি নামে লোকটা সিগারেট টানতে টানতেই সোজা হয়ে বসলেন। পরিকল্পনা করছেন এমন ভঙ্গিতে বাকিদের কীসব বুঝাতে লাগলেন এই লোকটা। রেশাওয়াত যা বুঝল তা এরকম-

এই সাতজন মানুষ ফার্মগেটে একটা অপারেশন চালাবে। অপারেশনের সময় মাত্র এক মিনিট!! বদি নামে লোকটা একজনকে লক্ষ্য করে বললেন, 'সামাদ, তুমি গাড়ি চালাবে।' আরেকজনকে বললেন, 'আলম তোমার চায়নিজ এলএমজিটা ঠিকঠাক তো?'। আর বাকিরা সম্ভবত স্টেনগান না কি যেন নিয়ে থাকবে। রেশাওয়াত আর যে শব্দগুলো ওদের পরিকল্পনা থেকে শুনল সেগুলো হল- রিভলবার, ফসফরাস গ্রেনেড আর গ্রেনেড-৩৬। পরিকল্পনা শেষ করে মানুষগুলোর মধ্যে বদি নামে লোকটা রেশাওয়াতকে তার নাম জিজ্ঞেস করল এবং বলল, 'আজ তোকে কিছুই দিতে পারব না রে। যেদিন এ দেশটা পাকসেনা মুক্ত হবে তোর এখানে আবার আসব। শুধু এ কয়জন না। আমাদের আরো লোক আছে। সবাই এসে খেয়ে যাব। আর বাসি ছোলা রাখবি না সেদিন কিন্তু।' রেশাওয়াত মৃদু হাসি দিয়ে বলল, 'জি আচ্ছা ভাই'।

লোকগুলো চলে গেল আটটা বাজার আগেই। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট দিয়ে ফার্মগেটের দিকেই গেল মনে হল সরাসরি।  

 

৩.

রেশাওয়াত গল্প শেষ করতে পারল না। ওর চোখে পানি চলে এল। অদিতি ওকে কি বলবে বুঝতে পারল না। রেশাওয়াত বলল, 'ক্র্যাক প্লাটুনের সাতজন এসেছিল অদিতি! ওরা আবার আসবে বলেছিল!' অশ্রু থামাতে পারল না অদিতিও। রাত পেরিয়ে গেল।

গল্পের শেষ অংশে চলে এসেছি। রেশাওয়াতের ফাস্টফুড ভালই চলছে। শুধু একটা পরিবর্তন ইদানিং দেখা যাচ্ছে। ফাস্টফুডের চারটা টেবিলের মাঝে তিনটাতে সবাই বসতে পারে, খেতে পারে। কোনার একটা টেবিলে রেশাওয়াত কাউকে বসতে দেয় না। কেন দেয়না কেউ জানেনা। সেখানে একটা কাঠের টুকরার মাঝে কাগজ লাগিয়ে রেশাওয়াত লিখে রেখেছে,

"RESERVED UNTIL THEY RETURN"

 

[ ফার্মগেট অপারেশন সংঘটিত হয় একাত্তর সালের ৭ আগস্ট। প্লাটুনের অন্যতম সদস্য সামাদের নিউ ইস্কাটনের বাসায় সবাই বসে সিদ্ধান্ত নেন ওই দিনই আক্রমণ চালাবেন তারা। অপারেশনের সময় নির্ধারিত হলো রাত ৮টা এবং এর জন্য সময় বরাদ্দ থাকবে ১ মিনিট। অস্ত্রসজ্জিত গেরিলা দলে ছিলেন ৭ তরুণ। জুয়েল, আলম, পুলু, স্বপন, সামাদ আর বদি। ঠিক করা হয় সামাদ গাড়ি চালাবেন। সবার হাতে থাকবে স্টেনগান, আলমের হাতে চায়নিজ এলএমজি। অতিরিক্ত অস্ত্রের মধ্যে সামাদের কাছে আছে রিভলবার, জুয়েল আর পুলুর কাছে আছে ফসফরাস গ্রেনেড আর গ্রেনেড-৩৬। এক মিনিটের মধ্যেই খান সেনা আর পাকি পেয়ারা রাজাকারদের দিগ্বিদিক অন্ধকার করে দেয় চৌকস গেরিলা দলটি। মুহূর্তেই মরণের স্বাদ পায় পাঁচ মিলিটারি পুলিশ ও ছয় রাজাকার। সফল এই অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন শহীদ বদিউজ্জামান।

এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে সারা ঢাকায়, আর নতুন উদ্যাম যোগ করে সারা দেশের মুক্তিকামী মানুষের মনে। আর ব্যাপক ভীতি সঞ্চার করে খান সেনা আর তাদের দোসর রাজাকারদের মধ্যে। এভাবেই অনেকগুলো সফল অপারেশন চালান এই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা। ]

প্রিয় পাঠক, ক্র্যাক প্লাটুন সম্পর্কে আরো জানুনঃ 

উইকিপিডিয়া

ক্র্যাক প্লাটুন : হার না মানা বীরত্বগাথা

একদল মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিযোদ্ধার ‘ক্র্যাক প্লাটুন’

দ্য লিজেন্ডারি ক্র্যাক প্লাটুন...


বিষয়ঃ মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগসমূহঃ গল্প মুক্তিযুদ্ধ শোকগাঁথা একাত্তর [ ৯৮১ ] 981 [ ৯ ] 9
  • শেয়ার করুনঃ
পাঠিয়ে দিনঃ

ব্লগারঃ অর্বাচীন উজবুক

ব্লগ লিখেছেনঃ ৩১ টি
ব্লগে যোগদান করেছেনঃ ২ বছর পূর্বে

৯ টি মন্তব্য ও প্রতিমন্তব্য

শাহিনুর ছালাফী

March 06, 2017 01:24 AM , ২ বছর পূর্বে
নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় তোমার লিখা ভাইয়া । উপস্থাপন টা অনবদ্য । ?
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

অর্বাচীন উজবুক
Mar 06, 2017 01:41 AM , ২ বছর পূর্বে
ধন্যবাদ। ?

মোঃ ফখরুল আমিন হৃদয়

March 06, 2017 11:39 AM , ২ বছর পূর্বে
অস্থির ভাই!!
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

অর্বাচীন উজবুক
Mar 06, 2017 11:56 AM , ২ বছর পূর্বে
ক্র্যাক প্লাটুন নিয়ে লিখতে গিয়ে হাত কাঁপছিল! ☺

মোঃ ফখরুল আমিন হৃদয়

March 06, 2017 02:57 PM , ২ বছর পূর্বে
তবুও শেষ করসেন, এবং পারফেক্টলি করসেন, এটা সবাই পারেনা ! hats off vai ! :_)
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

অর্বাচীন উজবুক
Mar 06, 2017 05:40 PM , ২ বছর পূর্বে
? কি যে ভালো লাগসে লিখে। অনুভূতিটাই আলাদা! ?

আসিফ আহমেদ

March 07, 2017 09:57 PM , ২ বছর পূর্বে
??????
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

অর্বাচীন উজবুক
Mar 16, 2017 01:03 PM , ২ বছর পূর্বে
??

আসিফ আহমেদ

March 07, 2017 09:58 PM , ২ বছর পূর্বে
??????
প্রতিমন্তব্য (লগইন)

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করবার জন্য আপনাকে লগইন করতে হবে।
ব্লগের তথ্য
মোট ব্লগারঃ ৬৬ জন
সর্বমোট ব্লগপোস্টঃ ৯৩ টি
সর্বমোট মন্তব্যঃ ১২২ টি


ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও-এ প্রকাশিত সকল লেখা এবং মন্তব্যের দায় লেখক-ব্লগার ও মন্তব্যকারীর। কোন ব্লগপোস্ট এবং মন্তব্যের দায় কোন অবস্থায় 'ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও' কর্তৃপক্ষ বহন করবে না