লিখেছেনঃ
2019-11-22BDT22:14 লেখার শিরোনাম দিয়েছি গ্রন্থ পর্যালোচনা। বিরাট গুরুগম্ভীর একটা আলোচনা সভা মনে হতে পারে। কিন্তু লেখার শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া ভালো এ 'মহান গ্রন্থ সমালোচক!' এর আগে একটি বিলাতী সিনেমা এবং একটা ছোট পুস্তকের সমালোচনার নামে বন্দনাগীতি ছাড়া কখনই গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন নাই! অভিজ্ঞতাও নেই। তাই এই নিবন্ধকে 'বই পড়ে অনুভূতি প্রকাশ' করা বলা যেতে পারে। মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।   জনাব আশীফ এন্তাজ রবি একজন চমৎকার কৌতুকরসবোধ সম্পন্ন মানুষ। ব্যক্তিগত ফেইসবুক দেওয়ালের বিভিন্ন পোস্টে এবং অন্যান্য লেখায় তার অনবদ্য রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। চন্দ্রমুখী গল্পে চন্দ্রমুখী বলতে মুনাকে বোঝানো হয়েছে। তবে মুনা এই গল্পের প্রধান চরিত্র না। ফরিদ এখানকার প্রধান চরিত্র। যার স্বভাব নানান রকম পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আজব আজব চিন্তা করা। সত্যিকার অর্থে যে চিন্তাগুলোই আমরা আমাদের অবচেতন-অর্ধচেতন মনে ভাবতে থাকি কিন্তু বস্তুত টের পাই না। লেখক এখানে ফরিদের চরিত্রে সে চিন্তাগুলো চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং প্রমাণ করেছেন ফরিদের রসবোধ প্রবল। এই কাজটা হুমায়ূন আহমেদ পারতেন খূব সূক্ষ্মভাবে। যার অনিন্দ্য দৃষ্টান্ত 'হিমু'। ফরিদের মাঝে মুনার যে উদাসীনভাব লেখক তুলে ধরেছেন বার বার কেন জানি হিমু আর রূপার কথা আমার মনে পড়েছে সে সময়গুলোতে। তবে হিমুর উদাসীনতা ছিল আসল। এই গল্পে ফরিদ উদাসীনতা দেখালেও বাস্তবে সে মুনাকে ভীষণ পছন্দ করে। কোন এক অদ্ভুত কারণে সে মুনার সামনে এসব প্রকাশ করতে চায় না। আরেকটা বিষয় ভীষণ ভালো লেগেছে, সেটা হল চরিত্র উপস্থাপন। খালেকুজ্জামান সাহেব নায়িকার বাবা হিসেবে অতোটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবার কথা না। গল্পের শেষ অংশে তার একটা চমৎকার সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তিনি যে এ সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা এবং বিচক্ষণতা রাখেন তা পাঠককে বোঝাবার জন্য খালেকুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে প্রথম দিকেই একটা বড় পর্ব লেখক সেরে নিয়েছেন। এরকম বেশ কিছু চরিত্র প্রয়োজনে এসেছে এবং গেছে। ফরিদের বাবা-মা দুজনের চরিত্রই কেন জানি একই মনে হয়েছে পুরোটা সময় জুড়ে। দুজনই নিতান্ত ভালোমানুষ। দুজনের সারল্য পাঠককে মুগ্ধ করলেও আমার ব্যক্তিগত মতামত হল তাদের যেকোন একজনের চরিত্রে লেখক খানিকটা প্রখরভাব ফুটিয়ে তুলতেই পারতেন। যা তিনি ইচ্ছা করেই করেন নি হয়তো। মুনার চরিত্রটা হুমায়ূন আহমেদের নারি চরিত্রগুলোর সাথে শতভাগ মিলে গেছে মনে হয়েছে। এবং কাকতালীয় কি না জানি না, এই মুনার মধ্যে 'আজ রবিবার' নাটকের মুনার আমি আশ্চর্যজনক মিল পেয়েছি। আমার ভ্রমও হতে পারে। গল্পের সব থেকে ভালো লাগা দিক হল, গল্প বলার স্টাইলটা। এতো সরলভাবে যে অনেক কথাই বলে দেওয়া যায়, সেটা লেখক দেখিয়ে দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় খালেকুজ্জামান মনে মনে বলছেন, "নেতা এবং পুলিশের রেট এখন এক। শুধু মানুষের রেটই কম। দিনে দিনে সেটা আরও কমছে।" গ্রন্থ পর্যালোচনা করার সময় নাকি সমালোচনা কিছু না কিছু করতেই হয়। তাই সামান্য কয়েকটা বিষয় বলে ফেলি। আকারে উপন্যাসটা আমার কাছে ছোটই মনে হয়েছে (তাই বারবার গল্প বলেছি)। লেখক আরেকটু কলেবরে বড় করে তুলতে পারতেন লেখাটা। পরের লাইনের জন্য স্পয়লার এলার্ট! যে গাড়িটা ফরিদকে নামিয়ে দিয়ে গেল, সেটা কেন মুনার বিয়ের কমিউনিটি সেন্টারের সামনেই নামিয়ে দিল বুঝিনি। এই বিষয়টাকে অতি কাকতালীয় মনে হয়েছে। শেষ পর্বটাতে (পরিশিষ্ট) সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটা অংশ এনে লেখক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন ফরিদ এবং তার পরিবারের করুন পরিণতির কারণে এ শহরের কারও কিছু যায় আসে না। বা এরকমই কিছু। এখানে আরও কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা অথবা পারুল-জামালের ঘটনাকেই আরেকটু অন্যভাবে প্রকাশ করলে আমার মতো বুদ্ধিহীন পাঠকের জন্য সুবিধা হতো। তবে এ বলতে দ্বিধা নেই পরিশিষ্ট অংশের শেষ প্যারার লেখাটুকু চমৎকার। সব মিলিয়ে 'চন্দ্রমুখী' একটি সুখপাঠ্য বই। হাসতে হাসতে লেখক কখন একটি দুটি চরিত্রকে খুন করে ফেলবেন টেরই পাবেন না! গুম হয়ে যাবার মত চরম অনিশ্চিত এবং হৃদয়বিদারক একটা ঘটনাকে লেখক যে হাস্যরস এবং চরিত্রগুলোর নিজস্ব কৌতুক দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অসামান্য লেগেছে। পুনশ্চঃ ব্যাক ইনারে লেখক পরিচিতি পড়ে ভীষণ মজা পেয়েছি। নিজেকে নিয়ে কৌতুক করা সবার সাধ্যের মধ্যে পড়ে না। ৭৮৫ ফেব্রুয়ারী ১২, ২০১৮ ০৫:২৬ অপরাহ্ন ১ বছর পূর্বে

চন্দ্রমুখী-আশীফ এন্তাজ রবি

লেখার শিরোনাম দিয়েছি গ্রন্থ পর্যালোচনা। বিরাট গুরুগম্ভীর একটা আলোচনা সভা মনে হতে পারে। কিন্তু লেখার শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া ভালো এ 'মহান গ্রন্থ সমালোচক!' এর আগে একটি বিলাতী সিনেমা এবং একটা ছোট পুস্তকের সমালোচনার নামে বন্দনাগীতি ছাড়া কখনই গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন নাই! অভিজ্ঞতাও নেই। তাই এই নিবন্ধকে 'বই পড়ে অনুভূতি প্রকাশ' করা বলা যেতে পারে। মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

 

জনাব আশীফ এন্তাজ রবি একজন চমৎকার কৌতুকরসবোধ সম্পন্ন মানুষ। ব্যক্তিগত ফেইসবুক দেওয়ালের বিভিন্ন পোস্টে এবং অন্যান্য লেখায় তার অনবদ্য রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। চন্দ্রমুখী গল্পে চন্দ্রমুখী বলতে মুনাকে বোঝানো হয়েছে। তবে মুনা এই গল্পের প্রধান চরিত্র না। ফরিদ এখানকার প্রধান চরিত্র। যার স্বভাব নানান রকম পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আজব আজব চিন্তা করা। সত্যিকার অর্থে যে চিন্তাগুলোই আমরা আমাদের অবচেতন-অর্ধচেতন মনে ভাবতে থাকি কিন্তু বস্তুত টের পাই না। লেখক এখানে ফরিদের চরিত্রে সে চিন্তাগুলো চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং প্রমাণ করেছেন ফরিদের রসবোধ প্রবল। এই কাজটা হুমায়ূন আহমেদ পারতেন খূব সূক্ষ্মভাবে। যার অনিন্দ্য দৃষ্টান্ত 'হিমু'। ফরিদের মাঝে মুনার যে উদাসীনভাব লেখক তুলে ধরেছেন বার বার কেন জানি হিমু আর রূপার কথা আমার মনে পড়েছে সে সময়গুলোতে। তবে হিমুর উদাসীনতা ছিল আসল। এই গল্পে ফরিদ উদাসীনতা দেখালেও বাস্তবে সে মুনাকে ভীষণ পছন্দ করে। কোন এক অদ্ভুত কারণে সে মুনার সামনে এসব প্রকাশ করতে চায় না। আরেকটা বিষয় ভীষণ ভালো লেগেছে, সেটা হল চরিত্র উপস্থাপন। খালেকুজ্জামান সাহেব নায়িকার বাবা হিসেবে অতোটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবার কথা না। গল্পের শেষ অংশে তার একটা চমৎকার সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তিনি যে এ সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা এবং বিচক্ষণতা রাখেন তা পাঠককে বোঝাবার জন্য খালেকুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে প্রথম দিকেই একটা বড় পর্ব লেখক সেরে নিয়েছেন। এরকম বেশ কিছু চরিত্র প্রয়োজনে এসেছে এবং গেছে।

ফরিদের বাবা-মা দুজনের চরিত্রই কেন জানি একই মনে হয়েছে পুরোটা সময় জুড়ে। দুজনই নিতান্ত ভালোমানুষ। দুজনের সারল্য পাঠককে মুগ্ধ করলেও আমার ব্যক্তিগত মতামত হল তাদের যেকোন একজনের চরিত্রে লেখক খানিকটা প্রখরভাব ফুটিয়ে তুলতেই পারতেন। যা তিনি ইচ্ছা করেই করেন নি হয়তো। মুনার চরিত্রটা হুমায়ূন আহমেদের নারি চরিত্রগুলোর সাথে শতভাগ মিলে গেছে মনে হয়েছে। এবং কাকতালীয় কি না জানি না, এই মুনার মধ্যে 'আজ রবিবার' নাটকের মুনার আমি আশ্চর্যজনক মিল পেয়েছি। আমার ভ্রমও হতে পারে।

গল্পের সব থেকে ভালো লাগা দিক হল, গল্প বলার স্টাইলটা। এতো সরলভাবে যে অনেক কথাই বলে দেওয়া যায়, সেটা লেখক দেখিয়ে দিয়েছেন। যেমন এক জায়গায় খালেকুজ্জামান মনে মনে বলছেন, "নেতা এবং পুলিশের রেট এখন এক। শুধু মানুষের রেটই কম। দিনে দিনে সেটা আরও কমছে।"

গ্রন্থ পর্যালোচনা করার সময় নাকি সমালোচনা কিছু না কিছু করতেই হয়। তাই সামান্য কয়েকটা বিষয় বলে ফেলি। আকারে উপন্যাসটা আমার কাছে ছোটই মনে হয়েছে (তাই বারবার গল্প বলেছি)। লেখক আরেকটু কলেবরে বড় করে তুলতে পারতেন লেখাটা। পরের লাইনের জন্য স্পয়লার এলার্ট! যে গাড়িটা ফরিদকে নামিয়ে দিয়ে গেল, সেটা কেন মুনার বিয়ের কমিউনিটি সেন্টারের সামনেই নামিয়ে দিল বুঝিনি। এই বিষয়টাকে অতি কাকতালীয় মনে হয়েছে। শেষ পর্বটাতে (পরিশিষ্ট) সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটা অংশ এনে লেখক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন ফরিদ এবং তার পরিবারের করুন পরিণতির কারণে এ শহরের কারও কিছু যায় আসে না। বা এরকমই কিছু। এখানে আরও কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা অথবা পারুল-জামালের ঘটনাকেই আরেকটু অন্যভাবে প্রকাশ করলে আমার মতো বুদ্ধিহীন পাঠকের জন্য সুবিধা হতো। তবে এ বলতে দ্বিধা নেই পরিশিষ্ট অংশের শেষ প্যারার লেখাটুকু চমৎকার।

সব মিলিয়ে 'চন্দ্রমুখী' একটি সুখপাঠ্য বই। হাসতে হাসতে লেখক কখন একটি দুটি চরিত্রকে খুন করে ফেলবেন টেরই পাবেন না! গুম হয়ে যাবার মত চরম অনিশ্চিত এবং হৃদয়বিদারক একটা ঘটনাকে লেখক যে হাস্যরস এবং চরিত্রগুলোর নিজস্ব কৌতুক দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অসামান্য লেগেছে।

পুনশ্চঃ ব্যাক ইনারে লেখক পরিচিতি পড়ে ভীষণ মজা পেয়েছি। নিজেকে নিয়ে কৌতুক করা সবার সাধ্যের মধ্যে পড়ে না।


বিষয়ঃ রিভিউ | ট্যাগসমূহঃ প্রবন্ধ রিভিউ [ ৭৮৫ ] 785 [ ০ ] 0
  • শেয়ার করুনঃ
পাঠিয়ে দিনঃ

ব্লগারঃ অর্বাচীন উজবুক

ব্লগ লিখেছেনঃ ৩১ টি
ব্লগে যোগদান করেছেনঃ ২ বছর পূর্বে

০ টি মন্তব্য ও প্রতিমন্তব্য

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করবার জন্য আপনাকে লগইন করতে হবে।
ব্লগের তথ্য
মোট ব্লগারঃ ৬৬ জন
সর্বমোট ব্লগপোস্টঃ ৯৩ টি
সর্বমোট মন্তব্যঃ ১২২ টি


ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও-এ প্রকাশিত সকল লেখা এবং মন্তব্যের দায় লেখক-ব্লগার ও মন্তব্যকারীর। কোন ব্লগপোস্ট এবং মন্তব্যের দায় কোন অবস্থায় 'ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও' কর্তৃপক্ষ বহন করবে না