লিখেছেনঃ
2019-11-21BDT12:55   এ পর্যন্ত আমরা ১৯০৬ সালে মরক্কো সমস্যা পর্যন্ত আলোচনা করেছি। এবং তিন বৃহৎ মিত্রশক্তি দেখেছি। যারা হচ্ছে যথাক্রমে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েকটি পয়েন্ট যদি দাঁড় করাই তাহলে পাই, ১. ব্রিটেন আর জার্মানির মধ্যে নৌযান প্রতিযোগিতা। কারণ ১৯০৬ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম 'ড্রেডনাউট (Dreadnought)' ব্যাটলশিপ তৈরি করে। আর জার্মানিও ততোদিনে বেশ উন্নতি করেছে ১৯৯৭ সালের 'Tirpitz's Navy Law' এর আওতায়।  ২. ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স জার্মানদের কাছে আলসেস আর লোরিন হারানো ৩. ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি করে। এরমধ্যে দিয়ে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স মৈত্রীচুক্তির আওতায় পরে এবং জার্মানী এটাকে তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে অভিযুক্ত করে।  ৪. বসনিয়ান সমস্যার পর অস্ট্রিয়া বসনিয়া তাদের দখলে নিলে রাশিয়া বলকান দেশগুলোতে অস্ট্রিয়ার উপস্থিতিতে ভীয় হয়ে পড়ে। ৫. সার্বিয়ান জাতীয়তা। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ ছিল। সার্বরা সবসময় সার্বভৌমত্ব চেয়ে এসেছে। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের অধিনে থাকা যুগোস্লাভিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দখলে ছিল। যেখানে বহু সার্ব আর ক্রোট রা থাকত এবং সার্বিয়া সবসময় তাদের এক করতে চেয়েছিলো। আর এই হার্বসবার্গ সাম্রাজ্যে বহু জাতীয়তার মানুষ ছিল যেমন, জার্মান, চেক, স্লোভাক, পোলিশ, রোমানিয়ান, স্লোভেন, হাঙ্গেরিয়ান, সার্ব, ক্রোট। এর মধ্যে থেকে যদি সার্ব এবং ক্রোটরা বের হয়ে যায় তবে অন্যান্য জাতিগুলোও আলাদা হতে চাইবে ফলে ভেঙ্গে যেতে পারে হ্যাবসাবার্গ সাম্রাজ্য। এজন্য অস্ট্রিয়া একটা "প্রতিরোধক যুদ্ধ (Preventive War)" চেয়েছিল যাতে সার্বিয়ার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারে এবং যাতে সার্বিয়া বড় কোন শক্তি হয়ে উঠতে না পারে।    এই কারণগুলো ছিল বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কিছু প্রত্যক্ষ কারণ। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ আছে। এক এক করে আলোচনা করছি। ইয়োমধ্যে মরক্কো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর আসি ১৯০৭ সালে।   ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়ার মাঝে মৈত্রীচুক্তি হয়। জার্মানদের কাছে যেটা একটা বড় পরাজয় ছিল। ১৮৯৪ সালে রাশিয়া আর ফ্রান্স চুক্তি করে আর ফ্রান্স হচ্ছে ১৯০৪ সালের করা ফ্রান্স-ব্রিটেনের "Entente Cordiale" চুক্তি করা ব্রিটেনের সহযোগী। এর আগে ব্রিটেন রাশিয়াকে তাদের একটা বড় হুমকি মনে করত ভারতবর্ষে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের কারণে। কিন্তু ইতোমধ্যে অবস্থা পাল্টেছে। ১৯০৪-০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ার হারার ফলে তাদের শক্তি অনেক কমে যায় এবং ব্রিটেন বুঝতে পারে রাশিয়ার সক্ষমতা। আর রাশিয়া খুঁজছিলো এক দীর্ঘসময়ের বন্ধু। এছাড়া শিল্পবিপ্লবের ফলে রাশিয়াতে নতুন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে যে জটিলতা ছিল তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পরে। এবং রাশিয়া ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ে। এই চুক্তির ফলে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মাঝে যে দূরত্বগুলো ছিল সেগুলো অনেকাংশে দূর হয়। এটা কোন সামরিক চুক্তি ছিল না। কিন্তু এ চুক্তির ফলে ফ্রান্স, রাশিয়া আর ব্রিটেন যে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয় জার্মানী সেটাকে তাদের বিরুদ্ধে গঠিত শক্তি হিসেবে মনে করে।   এরপর ১৯০৮ সালে হয় 'বসনিয়া সমস্যা'। এটা একটা বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। বসনিয়ায় ছিল তুরস্কের বর্ধিতাংশে দেখা দেয় বিপ্লব। এর সুযোগ নেয় অস্ট্রিয়া। তারা দখল করে বসনিয়া। এদিকে অন্যদেরও বসনিয়া নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বসনিয়া সার্বিয়ার পাশের রাষ্ট্র। বসনিয়া নিয়ে সার্বিয়ারও আগ্রহ ছিল চূড়ান্ত কারণ বসনিয়ায় ৩০ লক্ষের মত সার্বরা থাকত যার মধ্যে সার্ব ছাড়াও ছিল ক্রোট এবং মুসলিম। সার্বিয়া তাদের ঘনিষ্ঠ সার্ভদের কাছে সাহায্য চায়। রাশিয়া বিশ্বব্যাপী একটা সম্মেলন ডেকে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের সমর্থন চায়। কিন্তু ব্যাপারটা পাল্টে গেল অন্যভাবে যখন সবাই দেখলো যদি এখানে যুদ্ধ শুরু হয় তবে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সবরকম সামরিক সহযোগিতা দিবে। ফ্রান্স বলকান অঞ্চলে কোন যুদ্ধে জড়িত হওয়ায় আগ্রহি ছিল না। ব্রিটেন তাদের আভিজাত্য থেকে কখনোই চাইত না জার্মানদের সাথে যুদ্ধে যেতে। আর জাপানের কাছে যুদ্ধে হারার পর রাশিয়া তখনো চুপচাপ। আরেকটা যুদ্ধের জন্য তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। ফলে সার্বিয়া সাহায্যের জন্য কাউকেই সাথে পেল না। কোন আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হল না। অস্ট্রিয়া বসনিয়াকে তাদের দখলেই রাখলো। জার্মানি-অস্ট্রিয়া সম্পর্কের এটা প্রথম বড় কোন অগ্রগতি ছিল। কিন্তু এর ফলে দুইটা বড় সমস্যা দেখা দেয়:   ১. সার্বিয়া আবারো অস্ট্রিয়ার নিচে পড়ে থাকে এবং সার্বদের ভেতরে ক্ষোভ বাড়তেই থাকে। ২. রাশিয়া তাদের অসহায় অবস্থা থেকে সরে আসে এবং বড় একটা সামরিক বাহিনী গঠন শুরু করে। যাতে এরপর সার্বিয়া যদি আবার কোন সাহায্য চায় তবে তারা যেন সাহায্য করতে পারে। আগাদির সমস্যা, ১৯১১ সাল এটা ছিল মরক্কো সমস্যারই একটা পরিবর্তিত রূপ। ফ্রান্সের ট্রুপস মরক্কোর রাজধানী 'ফেজ' দখল করে যাতে সুলতানের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করা যায়। ফ্রান্স মরক্কোকে তাদের বর্ধিতাংশ বানাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জার্মানি তাদের সশস্ত্র জাহাজ 'প্যানথার' মরক্কোর 'পোর্ট অফ আগাদির' এ প্রেরণ করে। তারা আশা করছিল যে তারা ফ্রান্সের উপর চাপ দিয়ে মরক্কো'র পালটা দখল নিবে, সেই সাথে ফরাসি কঙ্গোও দখলে আনবে। আগাদির জার্মানদের দখলে যাওয়ায় ব্রিটেন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কারণ এতে তাদের ট্রেড রুট হুমকির মুখে দাঁড়ায়। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের Chancellor of Exchequer, লয়েড জর্জ একটি ভাষণ দেন, যেখানে তিনি জার্মানিকে সতর্ক করে বলেন যে, যেখানে ব্রিটেনের সার্থে আঘাত করা হবে সেখানে ব্রিটেন দাঁড়িয়ে থাকবে না বরং সামনে বাড়বে। এদিকে ফ্রান্সও তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি আগাদির থেকে তাদের গানবোট সরায়। এটা অক্ষশক্তির একটা বড় জিয় ছিল।   এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ ১৯১২-১৯১৩ যুদ্ধটা শুরু হয় যখন সার্বিয়া, গ্রিস, মন্টিনেগ্রো এবং বুলগেরিয়া (যারা 'বলকান লীগ' হিসেবে পরিচিত ছিল), তুরস্কে আঘাত করে। জলদিই জার্মান সরকার এবং ব্রিটেন ফরেইন সেক্রেটারি স্যাএ এডওয়ার্ড গ্রে লণ্ডনে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেটা শেষ হয় তুরস্ককে বলকান লীগের দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এ নিয়ে সার্বিয়া খুশি ছিল না। তারা আলবেনিয়া চেয়ে বসে যাতে তারা সহজেই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অস্ট্রিয়া জার্মান এবং ব্রিটেনের সহযোগিতায় ঘোষনা করে যে আলবেনিয়া একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে। সার্বিয়াকে শক্তিশালি হওয়া থেকে বিরত রাখাতে এটা অস্ট্রিয়ার আরেকটি জয় ছিল।    এরপর দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ শুরু হয় যখন বুলগেরিয়া তাদের প্রাপ্তি নিয়ে অখুশি হয় এবং মেসিডোনিয়াকে চেয়ে বসে। বুলগেরিয়া সার্বিয়াকে অ্যাটাক করে কারণ এর বেশিরভাগ অঞ্চল সার্বিয়ার ভাগ্যে পরে। কিন্তু বুলগেরিয়ার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয় যখন গ্রিস, তুরস্ক, এবং রোমানিয়া সার্বিয়াকে সহযোগিতা দেয়। বুলগেরিয়া পরাজিত হয় 'বুখারেস্ট চুক্তি ১৯১৩' দ্বারা যেটাতে বুলগেরিয়া প্রথম যুদ্ধ থেকে তারা যা পেয়েছিল তাই হারায়। কিন্তু এখানে দু'টো সমস্যা দেখা দেয়। ১. অস্ট্রয়া সার্বিয়ার এ জয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ২. অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মাঝে বসবাসরত সার্ব এবং ক্রোটরা হুমকির মুখে পড়ে যায়।   ইতোমধ্যে সার্বিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে ব্রিটেন-ফ্রান্সের সাথে জার্মানির বিভেদ চরমে পৌছে গেছে। বিশ্ব তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত। শুধু একটি উপলক্ষ বাকি। এই উপলক্ষটুকুও শিঘ্রই এসে গেল।     ১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়া ভ্রমণকালে বসনিয়া'র রাজধানী সারজেভোতে "গার্ভিলো প্রিন্সিপ" নামে একজন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক "ফ্রাঞ্জ ফার্ডিন্যান্ড" এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে সে স্বীকার করে সে একজন সার্ব। অস্ট্রিয়া এতে সার্বিয়াকে দোষী বলে দাবি করে এবং সার্বিয়ান সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়ান সরকার অস্ট্রিয়ার রিপোর্টের বেশিরিভাগ পয়েন্টই স্বীকার করেছিল। কিন্তু জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া এই ঘটনাটিকে যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে চালাতে চেয়েছিল।    অবশেষে ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অস্ট্রিয়া আবার সার্বিয়ার উপর চরাও হওয়াতে এবার রাশিয়া সার্বিয়ার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের সৈন্য সাজাতে নির্দেশ দেয় সেনাবাহিনীকে। জার্মানি এটা বন্ধ করতে বলে কিন্তু রাশিয়া তা উপেক্ষা করে। ফলে ১ আগস্ট রাশিয়া এবং ৩ আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যখন জার্মান সৈন্যরা ফ্রান্স অ্যাটাক করার জন্য বেলজিয়ামের পথকে বেছে নেয় তখন ব্রিটেনও নড়েচড়ে বসে। কারণ ১৮৩৯ সালে বেলজিয়ামের সাথে চুক্তি অনুযায়ি বেলজিয়ানকে নিরপেক্ষ রাখতে ব্রিটেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের নিষেধ অমান্য করায় ব্রিটেন ৪ আগস্ট যুদ্ধে প্রবেশ করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবার ৬ আগস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অন্যান্য দেশগুলো আরো পরে যুদ্ধে যোগ দেয়।    "মনরো মতবাদ" অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল। অন্য মহাদেশে যুদ্ধের ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তি সাথে যুদ্ধে যোভ দেয়।    মানবজাতির ইতিহাসে এ যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এটা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অথচ যুদ্ধের পিছনে কারণটা আর কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতার লোভ।    "মনরো মতবাদ" এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে এরপরের কোন লেখায় আলোচনা করব। আজ এ পর্যন্তই শেষ করলাম।   বিবলিওগ্রাফি: ১. International Relations between two world 1919-1939 war by E.H. Carr ২. Mastering Modern World History by Norman Lowe ৩. History of International Relations   ৪২৪ মার্চ ১০, ২০১৭ ১১:২২ অপরাহ্ন ২ বছর পূর্বে

 

এ পর্যন্ত আমরা ১৯০৬ সালে মরক্কো সমস্যা পর্যন্ত আলোচনা করেছি। এবং তিন বৃহৎ মিত্রশক্তি দেখেছি। যারা হচ্ছে যথাক্রমে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কয়েকটি পয়েন্ট যদি দাঁড় করাই তাহলে পাই,

১. ব্রিটেন আর জার্মানির মধ্যে নৌযান প্রতিযোগিতা। কারণ ১৯০৬ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম 'ড্রেডনাউট (Dreadnought)' ব্যাটলশিপ তৈরি করে। আর জার্মানিও ততোদিনে বেশ উন্নতি করেছে ১৯৯৭ সালের 'Tirpitz's Navy Law' এর আওতায়। 

২. ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স জার্মানদের কাছে আলসেস আর লোরিন হারানো

৩. ১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি করে। এরমধ্যে দিয়ে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স মৈত্রীচুক্তির আওতায় পরে এবং জার্মানী এটাকে তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলে অভিযুক্ত করে। 

৪. বসনিয়ান সমস্যার পর অস্ট্রিয়া বসনিয়া তাদের দখলে নিলে রাশিয়া বলকান দেশগুলোতে অস্ট্রিয়ার উপস্থিতিতে ভীয় হয়ে পড়ে।

৫. সার্বিয়ান জাতীয়তা। এটাই সবচেয়ে বড় কারণ ছিল। সার্বরা সবসময় সার্বভৌমত্ব চেয়ে এসেছে। হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের অধিনে থাকা যুগোস্লাভিয়া অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দখলে ছিল। যেখানে বহু সার্ব আর ক্রোট রা থাকত এবং সার্বিয়া সবসময় তাদের এক করতে চেয়েছিলো। আর এই হার্বসবার্গ সাম্রাজ্যে বহু জাতীয়তার মানুষ ছিল যেমন, জার্মান, চেক, স্লোভাক, পোলিশ, রোমানিয়ান, স্লোভেন, হাঙ্গেরিয়ান, সার্ব, ক্রোট। এর মধ্যে থেকে যদি সার্ব এবং ক্রোটরা বের হয়ে যায় তবে অন্যান্য জাতিগুলোও আলাদা হতে চাইবে ফলে ভেঙ্গে যেতে পারে হ্যাবসাবার্গ সাম্রাজ্য। এজন্য অস্ট্রিয়া একটা "প্রতিরোধক যুদ্ধ (Preventive War)" চেয়েছিল যাতে সার্বিয়ার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারে এবং যাতে সার্বিয়া বড় কোন শক্তি হয়ে উঠতে না পারে। 

 

এই কারণগুলো ছিল বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কিছু প্রত্যক্ষ কারণ। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ আছে। এক এক করে আলোচনা করছি। ইয়োমধ্যে মরক্কো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর আসি ১৯০৭ সালে।

 

১৯০৭ সালে ব্রিটেন আর রাশিয়ার মাঝে মৈত্রীচুক্তি হয়। জার্মানদের কাছে যেটা একটা বড় পরাজয় ছিল। ১৮৯৪ সালে রাশিয়া আর ফ্রান্স চুক্তি করে আর ফ্রান্স হচ্ছে ১৯০৪ সালের করা ফ্রান্স-ব্রিটেনের "Entente Cordiale" চুক্তি করা ব্রিটেনের সহযোগী। এর আগে ব্রিটেন রাশিয়াকে তাদের একটা বড় হুমকি মনে করত ভারতবর্ষে ব্রিটেন সাম্রাজ্যের কারণে। কিন্তু ইতোমধ্যে অবস্থা পাল্টেছে। ১৯০৪-০৫ সালের রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ার হারার ফলে তাদের শক্তি অনেক কমে যায় এবং ব্রিটেন বুঝতে পারে রাশিয়ার সক্ষমতা। আর রাশিয়া খুঁজছিলো এক দীর্ঘসময়ের বন্ধু। এছাড়া শিল্পবিপ্লবের ফলে রাশিয়াতে নতুন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে যে জটিলতা ছিল তা অনেকাংশে শিথিল হয়ে পরে। এবং রাশিয়া ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ে। এই চুক্তির ফলে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মাঝে যে দূরত্বগুলো ছিল সেগুলো অনেকাংশে দূর হয়। এটা কোন সামরিক চুক্তি ছিল না। কিন্তু এ চুক্তির ফলে ফ্রান্স, রাশিয়া আর ব্রিটেন যে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয় জার্মানী সেটাকে তাদের বিরুদ্ধে গঠিত শক্তি হিসেবে মনে করে।

 

এরপর ১৯০৮ সালে হয় 'বসনিয়া সমস্যা'।

এটা একটা বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। বসনিয়ায় ছিল তুরস্কের বর্ধিতাংশে দেখা দেয় বিপ্লব। এর সুযোগ নেয় অস্ট্রিয়া। তারা দখল করে বসনিয়া। এদিকে অন্যদেরও বসনিয়া নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্যাপক। বসনিয়া সার্বিয়ার পাশের রাষ্ট্র। বসনিয়া নিয়ে সার্বিয়ারও আগ্রহ ছিল চূড়ান্ত কারণ বসনিয়ায় ৩০ লক্ষের মত সার্বরা থাকত যার মধ্যে সার্ব ছাড়াও ছিল ক্রোট এবং মুসলিম। সার্বিয়া তাদের ঘনিষ্ঠ সার্ভদের কাছে সাহায্য চায়। রাশিয়া বিশ্বব্যাপী একটা সম্মেলন ডেকে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের সমর্থন চায়। কিন্তু ব্যাপারটা পাল্টে গেল অন্যভাবে যখন সবাই দেখলো যদি এখানে যুদ্ধ শুরু হয় তবে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সবরকম সামরিক সহযোগিতা দিবে। ফ্রান্স বলকান অঞ্চলে কোন যুদ্ধে জড়িত হওয়ায় আগ্রহি ছিল না। ব্রিটেন তাদের আভিজাত্য থেকে কখনোই চাইত না জার্মানদের সাথে যুদ্ধে যেতে। আর জাপানের কাছে যুদ্ধে হারার পর রাশিয়া তখনো চুপচাপ। আরেকটা যুদ্ধের জন্য তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। ফলে সার্বিয়া সাহায্যের জন্য কাউকেই সাথে পেল না। কোন আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হল না। অস্ট্রিয়া বসনিয়াকে তাদের দখলেই রাখলো। জার্মানি-অস্ট্রিয়া সম্পর্কের এটা প্রথম বড় কোন অগ্রগতি ছিল। কিন্তু এর ফলে দুইটা বড় সমস্যা দেখা দেয়:

 

১. সার্বিয়া আবারো অস্ট্রিয়ার নিচে পড়ে থাকে এবং সার্বদের ভেতরে ক্ষোভ বাড়তেই থাকে।

২. রাশিয়া তাদের অসহায় অবস্থা থেকে সরে আসে এবং বড় একটা সামরিক বাহিনী গঠন শুরু করে। যাতে এরপর সার্বিয়া যদি আবার কোন সাহায্য চায় তবে তারা যেন সাহায্য করতে পারে।

আগাদির সমস্যা, ১৯১১ সাল

এটা ছিল মরক্কো সমস্যারই একটা পরিবর্তিত রূপ। ফ্রান্সের ট্রুপস মরক্কোর রাজধানী 'ফেজ' দখল করে যাতে সুলতানের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করা যায়। ফ্রান্স মরক্কোকে তাদের বর্ধিতাংশ বানাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জার্মানি তাদের সশস্ত্র জাহাজ 'প্যানথার' মরক্কোর 'পোর্ট অফ আগাদির' এ প্রেরণ করে। তারা আশা করছিল যে তারা ফ্রান্সের উপর চাপ দিয়ে মরক্কো'র পালটা দখল নিবে, সেই সাথে ফরাসি কঙ্গোও দখলে আনবে। আগাদির জার্মানদের দখলে যাওয়ায় ব্রিটেন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে কারণ এতে তাদের ট্রেড রুট হুমকির মুখে দাঁড়ায়। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের Chancellor of Exchequer, লয়েড জর্জ একটি ভাষণ দেন, যেখানে তিনি জার্মানিকে সতর্ক করে বলেন যে, যেখানে ব্রিটেনের সার্থে আঘাত করা হবে সেখানে ব্রিটেন দাঁড়িয়ে থাকবে না বরং সামনে বাড়বে। এদিকে ফ্রান্সও তাদের অবস্থানে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি আগাদির থেকে তাদের গানবোট সরায়। এটা অক্ষশক্তির একটা বড় জিয় ছিল।

 

এরপর প্রথম ও দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ ১৯১২-১৯১৩

যুদ্ধটা শুরু হয় যখন সার্বিয়া, গ্রিস, মন্টিনেগ্রো এবং বুলগেরিয়া (যারা 'বলকান লীগ' হিসেবে পরিচিত ছিল), তুরস্কে আঘাত করে। জলদিই জার্মান সরকার এবং ব্রিটেন ফরেইন সেক্রেটারি স্যাএ এডওয়ার্ড গ্রে লণ্ডনে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেটা শেষ হয় তুরস্ককে বলকান লীগের দেশগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এ নিয়ে সার্বিয়া খুশি ছিল না। তারা আলবেনিয়া চেয়ে বসে যাতে তারা সহজেই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অস্ট্রিয়া জার্মান এবং ব্রিটেনের সহযোগিতায় ঘোষনা করে যে আলবেনিয়া একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে। সার্বিয়াকে শক্তিশালি হওয়া থেকে বিরত রাখাতে এটা অস্ট্রিয়ার আরেকটি জয় ছিল। 

 

এরপর দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ শুরু হয় যখন বুলগেরিয়া তাদের প্রাপ্তি নিয়ে অখুশি হয় এবং মেসিডোনিয়াকে চেয়ে বসে। বুলগেরিয়া সার্বিয়াকে অ্যাটাক করে কারণ এর বেশিরভাগ অঞ্চল সার্বিয়ার ভাগ্যে পরে। কিন্তু বুলগেরিয়ার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয় যখন গ্রিস, তুরস্ক, এবং রোমানিয়া সার্বিয়াকে সহযোগিতা দেয়। বুলগেরিয়া পরাজিত হয় 'বুখারেস্ট চুক্তি ১৯১৩' দ্বারা যেটাতে বুলগেরিয়া প্রথম যুদ্ধ থেকে তারা যা পেয়েছিল তাই হারায়। কিন্তু এখানে দু'টো সমস্যা দেখা দেয়।

১. অস্ট্রয়া সার্বিয়ার এ জয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।

২. অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মাঝে বসবাসরত সার্ব এবং ক্রোটরা হুমকির মুখে পড়ে যায়।

 

ইতোমধ্যে সার্বিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে ব্রিটেন-ফ্রান্সের সাথে জার্মানির বিভেদ চরমে পৌছে গেছে। বিশ্ব তখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত। শুধু একটি উপলক্ষ বাকি। এই উপলক্ষটুকুও শিঘ্রই এসে গেল।  

 

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়া ভ্রমণকালে বসনিয়া'র রাজধানী সারজেভোতে "গার্ভিলো প্রিন্সিপ" নামে একজন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক "ফ্রাঞ্জ ফার্ডিন্যান্ড" এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। পরে সে স্বীকার করে সে একজন সার্ব। অস্ট্রিয়া এতে সার্বিয়াকে দোষী বলে দাবি করে এবং সার্বিয়ান সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়ান সরকার অস্ট্রিয়ার রিপোর্টের বেশিরিভাগ পয়েন্টই স্বীকার করেছিল। কিন্তু জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া এই ঘটনাটিকে যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে চালাতে চেয়েছিল। 

 

অবশেষে ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অস্ট্রিয়া আবার সার্বিয়ার উপর চরাও হওয়াতে এবার রাশিয়া সার্বিয়ার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের সৈন্য সাজাতে নির্দেশ দেয় সেনাবাহিনীকে। জার্মানি এটা বন্ধ করতে বলে কিন্তু রাশিয়া তা উপেক্ষা করে। ফলে ১ আগস্ট রাশিয়া এবং ৩ আগস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যখন জার্মান সৈন্যরা ফ্রান্স অ্যাটাক করার জন্য বেলজিয়ামের পথকে বেছে নেয় তখন ব্রিটেনও নড়েচড়ে বসে। কারণ ১৮৩৯ সালে বেলজিয়ামের সাথে চুক্তি অনুযায়ি বেলজিয়ানকে নিরপেক্ষ রাখতে ব্রিটেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের নিষেধ অমান্য করায় ব্রিটেন ৪ আগস্ট যুদ্ধে প্রবেশ করে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবার ৬ আগস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অন্যান্য দেশগুলো আরো পরে যুদ্ধে যোগ দেয়। 

 

"মনরো মতবাদ" অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ থেকে বিরত ছিল। অন্য মহাদেশে যুদ্ধের ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তি সাথে যুদ্ধে যোভ দেয়। 

 

মানবজাতির ইতিহাসে এ যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এটা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অথচ যুদ্ধের পিছনে কারণটা আর কিছুই ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতার লোভ। 

 

"মনরো মতবাদ" এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে এরপরের কোন লেখায় আলোচনা করব। আজ এ পর্যন্তই শেষ করলাম।

 

বিবলিওগ্রাফি:

১. International Relations between two world 1919-1939 war by E.H. Carr

২. Mastering Modern World History by Norman Lowe

৩. History of International Relations

 


বিষয়ঃ আন্তর্জাতিক | ট্যাগসমূহঃ প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক ইতিহাস [ ৪২৪ ] 424 [ ০ ] 0
  • শেয়ার করুনঃ
পাঠিয়ে দিনঃ

ব্লগারঃ আব্দুস সামী

ব্লগ লিখেছেনঃ ১৩ টি
ব্লগে যোগদান করেছেনঃ ২ বছর পূর্বে

০ টি মন্তব্য ও প্রতিমন্তব্য

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করবার জন্য আপনাকে লগইন করতে হবে।
ব্লগের তথ্য
মোট ব্লগারঃ ৬৬ জন
সর্বমোট ব্লগপোস্টঃ ৯৩ টি
সর্বমোট মন্তব্যঃ ১২২ টি


ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও-এ প্রকাশিত সকল লেখা এবং মন্তব্যের দায় লেখক-ব্লগার ও মন্তব্যকারীর। কোন ব্লগপোস্ট এবং মন্তব্যের দায় কোন অবস্থায় 'ব্লগ | হিউম্যানস অব ঠাকুরগাঁও' কর্তৃপক্ষ বহন করবে না